বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭

রাত্তির কথা

রাত্রি অনেক কঠিন, তার যেন দায় অন্তঃসার খুঁজে বের করবার। ক্লোরোফিলকে চাগিয়ে তোলবার কোনো ইচ্ছা তার নেই, মনের বাইরে বাকলের মতো যে শরীর তাকে ক্লান্ত অবসন্ন করে দিতে পারলেই যেন সে সফল। আগ্রহ-উচ্ছাস-উন্মাদনা নিয়ে আলোর প্রতি জীবনের যে স্পৃহা। সতেজের যে সব বিশেষণ, সবই তো আলো। দিনের আলো। শহর-আধুনিকতা-প্রযুক্তির কারিগরিতে সেই আলোয় আর নির্জনতা নেই। তার খোঁজে মানুষ ছেড়ে প্রকৃতির কাছে যেতে হয়। সবাই জীবনানন্দ হয়না, যে এই ভিড়েও ভিতরের চিলেকোঠা টাকে অস্থির রেখে যাবে। মাছির মতো হীন জীবের মধ্যেও জীবনের রস-স্পৃহা-অভিলাষ খুঁজে পাবে। রাত্রি নিরবিচ্ছিন্ন নির্জনতা উপহার দেয়। সাধনার প্রয়োজন হয়না। রাত্রি নিজেই সাধু। তার জঠরে এখনো বিস্তৃত অন্ধকার। যার নির্জনতা বিস্তার হয়ে যায় আকাশ পর্যন্ত। স্থির। শুধু অন্তরের আলোটুকু খোঁজার পাগলামি দিয়ে যায় তারায় তারায়।চাঁদের আলো চুমো দিয়ে যায়, প্রেয়সীর কোমল মলিনতা দিয়ে যায় সারাদিনের ক্ষতদাগে। "সূর্য পোড়া ছাই" গুলো শান্ত হয়। ইচ্ছামতো উড়ে বেরোয়। কত শরীর মিশে যায় শরীরের সাথে। অবিকল অর্ধনারীশ্বর। কামনার গন্ধ নভেম্বরের ছাতিমের সাথে মিশে, বর্ষার কদমের সাথে ঝড়ে, মে মাসের কৃষ্ণচূড়ার আভায় পুড়িয়ে দিয়ে যায় শরীরটুকু। জেগে ওঠে আত্মা। বিরল সেই মুহূর্তে ঘন হয়ে আসে সুর। তালে তালে দুলে ওঠে অর্ধনারীশ্বর। দুলে উঠে সৃষ্টির আগুন। নির্মাণের আয়োজন অপ্রয়োজনীয় হয়।চেতনার চৈতণ্য - অবচেতনের অনুধাবন মিলে মিশে সে যেন এক স্বপ্নিল ইচ্ছেডাঙা। মহাকালের যেন কত কাছে। কত বেশী বীজময়।যার নাভিতে কেউ নেই। শুধু পথ আর পথ। পথিকের আলস্যে স্নিগ্ধ রজনীগন্ধা, জুঁইয়ের চুম্বন। কোনো চাঁদ নয়। কোটি কোটি তারা। আবার হয়তো তারাও নয়, শুধু আঁধার আর মরচে ধরা মেঘ।স্থবির।

মধ্যরাত্তির দরজায় কড়াঘাতে কড়াঘাতে তোলপাড় হয়, যারা এখনো স্বপ্ন দেখে তারা প্রশ্ন করে রিলকের মতো করে-শক্তির মতো করে-অশীতিপর বৃদ্ধ অশ্বথ্থের মতো করে। তারা খসে -খসে পড়ে চেতনা-টলমল পায়ে সিদ্ধান্তগুলোও দুলতে থাকে। কিছুতেই জ্যা রোপণ করতে পারেন না ধনুর্ধর অর্জুন। টুকরো টুকরো করে ক্ষয়ে যায় খোসার মত শরীর। অবসন্ন। অবসাদ।এই সবই তো আগ্রহের মৃত্যু ডেকে আনে। অন্ধকার রোজ রাত্রে জিতে যায়। সবকিছু পুড়িয়ে শুধু অন্তঃসারটুকুকে খুঁজে চলে। নির্বাণহীন বিস্তৃত অন্তরের নির্জন মাঠটুকু খুঁজে চলে। সেই মেষপালককে খুঁজে চলে।সেই ঝাঁকড়া মাথার গাছটাকে খুঁজে চলে। যৌবনের যে বাড়-বাড়ন্ত - কেবল অকারণ নতুনের যে আয়োজন, তাকে টিটকিরি দেয়-সমস্ত দেহ গুঁড়িয়ে যায়। বৃদ্ধপাগল বেহালা বাজায়। আমি তাকে প্রশ্ন করি, "সারাদিন কি কর তুমি? ডিঙি সেজে শুয়ে থাকো ঘাটে? দোলা খাও, পৃথিবীর দোলা"।

অন্তর্হিত পৃথিবী ডাইনির মতো, চাঁদের বুড়ি সেজে চক্কর কাটে সারাটা সকালের উঠোন দিয়ে, ব্যস্ততার, হট্টগোলের, দেনাপাওনার, চাতুরির বেলাইন ঘিরে। অক্সিজেন কমে আসে। অন্তর্হিত সেই পুকুরের জলে কদমের সঘন ছায়া আর পদতলে শেষরাতের ইতর বিশেষ- সোনালী কদমরেণুর কার্পেট। অফিসের কম্পিউটার-কি বোর্ড-কাচের গরাদ-হিসেব নিকেশ ভেঙে ঢেউ আসে, টাইটানিক ভাঙা ঢেউ। ভেসে যায়। আস্ত সকাল বেলা-ফ্যাটফ্যাটে রোদে রাত্রি আসীন হয়। কবিতায় নয়। জীবনানন্দে নয়। গাঁজা চরসের ছিলামে নয়। সুস্থ পিৎজা খাওয়ার ন্যাকামির কোলকাতায়। "চড়াই শালিক ভেসে যায় পানা চড়ে। আর তুমি পানা সেজে ভেসে যাও। হা করে চেয়ে দেখে সূর্যের আকাশ। মেঘের আকাশ। শুণ্যের আকাশ। পাখীর আকাশ। বুকে চড়াই শালিক নিয়ে আমার অন্তর্হিত পৃথিবী।  সাধনা। সাধু সেজে কোথায় চলে যাও? অপুর মতো ছুটে যাই তেল-হলুদ গন্ধমাখা মায়ের আচলে বেঁধে নেই শিকড় টুকু।আমি পায়ে পড়ি সেই নির্জনতার, আমায় ছেড়ে দাও। আমার সেই সাহস নেই। আমার বুড়া মা আছে। বাপ আছে। ফাজিল বাপ গান গায়, তেমন আয় নেই। আমার চাকরবৃত্তিটুকু ওদের নিঃশ্বাস। স্বপ্নের লাটাই। আমি অযোগ্য। হিমালয় অবধি ছুটে যেতে হয় হিমালয় দেখতে। বিভূতিভূষণ নই। আমার অন্তর্হিত জগতে কদমের কার্পেট আছে, ছেড়ে যাওয়া প্রেয়সীর কান্দুনি আছে। সাদামাটা। পটল-টমেটো টিপে কেনা মধ্যবিত্ত। রাত্রি আমায় আছাড়ি পিছাড়ি মারে। আমি অফিসে মন দিতে চাই। সে বাঁধা ডিঙি সেজে আমায় অবসাদ দেয়। অবসাদ। একরাত্রি অবসাদ কি একটা সকালের থেকে বড়। নভেম্বরের কোলকাতার দুপুরের থেকে আকর্ষণ বেশী তার কিংবা বিকর্ষণ। সামাণ্য মৃত্যুর জন্যেও তো নিঃস্তব্ধতা লাগে। সকালের রোদটুকু তাও দেয়না! আমি ধাক্কা খাই। চক্রের ভিতরে চক্কর কাটি। ফোন খুলে পুরোনো বান্ধবীদের নম্বর খুঁজি। হাত পুড়ে যায় পরস্ত্রীর নিষিদ্ধতায়। আমি নিষিদ্ধ ছুঁতে চাই। নির্বান্ধব এই উপকূলে। গোড়ালির শেষ বিন্দুটুকু মাত্র বাজি রেখে নিষিদ্ধ ছুঁতে সাহস লাগেনা। এতো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্রতিবর্ত্তি ক্রিয়া। বুকের ভিতরে একতা ঢালু খাদ। তবু আমি স্বপ্নের বিশ্বাসে সোজা হতে চাই। জুনার গালির (উত্তরাখণ্ডের এক ক্ষুদ্র পর্বত পথ, ত্রিশুল পর্বত শৃঙ্গ এখান থেকে খুব কাছে দেখায়) মতো। শুধু ত্রিশুল দেখার বিশ্বাসের মতো। চাঁদের আলোয় ত্রিশুল। সানরাইজের ত্রিশুল। বরফ ঝড়ের ত্রিশুল। জুনার গালি কাত হয়ে থাকে। ঢালু হয়ে থাকে। সব্বাইকে ফেলে দিতে চায়। কিন্তু স্বপ্নের থেকে মাধ্যাকর্ষণের জোর কম। বিশ্বাসের থেকে অন্ধকারের আতঙ্ক ফিকে। যুক্তির-জ্ঞানের-বিচার-বুদ্ধির থেকে বড় হয়ে যায় উপলব্ধি। সত্যের অতীব কাছে যে উপলব্ধি। অন্ধকারেও পথ দেখায় যে নক্ষত্র। আমি তার কাঁধে ভর দিয়ে থাকি। দেখা যায় না যে পথ সেই তো জীবন। তার দিকে তাকিয়ে থাকি। অনুভূতি-উপলব্ধির সেই ঈশ্বরকে ছুঁয়ে দেখি। তার যোনিমুখ দিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে সমগ্র ভবিষ্যত। সেই অনাগতের অপেক্ষায়-বিশ্বাসে-রহস্যে-কল্পনায় দোলা খাই। পৃথিবীর দোলা।

৩টি মন্তব্য: