স্বাধীনতার ৭১তম বর্ষে পৌঁছে আজ স্বাধীনতা ও তা নিয়ে আমার নিজস্ব ভাবনার তাগিদ অনুভব করলাম। সব প্রশ্নের এক কথায় জবাব দেওয়া যায় না ঠিকই, তবু ছোট করে বল্লে স্বাধীনতা বলতে আমার কাছে চিন্তা ও ভাবনার স্বাধীনতা, মূলতঃ চিন্তা ও ভাবনার যে প্রক্রিয়া তার স্বাধীনতা। চিন্তা-স্রোতের স্বাধীনতা এক দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া, যা যথাযথ অভ্যাস ও গভীর মনন এবং পরিসরে গড়ে ওঠে।
যেকোনো আলোচনা শুরুর করার আগে আলোচ্য বিষয়ের একটি সংজ্ঞা বা সীমা নির্দেশ করে দেওয়ার প্রয়োজন। সেই মোতাবেক "চিন্তা-স্রোত" বা "চিন্তা ও ভাবনার প্রক্রিয়া"-র অর্থে আমি সেই প্রক্রিয়ার কথা বলছি যা যেকোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি (যা মূলত চিন্তন প্রক্রিয়ার ফল) গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
সেই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতার অর্থ? আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে ভাবি, তখন কিভাবে তা পরাধীন হতে পারে? ভাবনার অর্থ ই তো স্বাধীনতা! কারণ সেই ভাবনার থেকেই মতামত তৈরী হয় এবং সেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে দিয়েই তো পৃথিবীর ২০১৭ বছরের (তারও বেশী নিঃসন্দেহে!) ইতিহাস-আন্দোলন রোমন্থ্ন করছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, এই বুড়ো পৃথিবীর (এই যে আলপটকা পৃথিবীকে বুড়ো বলে বসলাম, কি নিয়মে? বুড়ো মানে কার থেকে বুড়ো বা কত বছর বয়স হলে একে বুড়ো বলা যায়? কিংবা বুড়ি বল্লাম না কেন? পুং-স্ত্রী-নপুংসক-ক্লীব কি ধরনের লিঙ্গ পৃথিবীর?) ইতিহাসের এক বড় অংশ বা মূল অংশ কিন্তু প্রাণিজগতের ও উদ্ভিদজগতের অভিযোজনের ইতিহাস। সেই অভিযোজনের ফলে যে শুধুমাত্র আমাদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া বা শারীরিক পরিবর্তন হয়েছে তা নয়, আমাদের চিন্তন ও তার প্রয়োগেরও পরিবর্তন হয়েছে। ক্লাসিকাল থেকে আমরা কোয়ান্টাম অবধি এসে পড়েছি। প্রাণিজগতের নানাবিধ স্বাভাবিক ধর্মের মধ্যে, যে লক্ষ্মণটি বারংবার ফুটে উঠেছে তা ডারউইনের ভাষায় যোগ্যতমের উদবর্তন (Survival of fittest) এবং কিভাবে আমরা( বর্তমান পৃথিবীর প্রাণিওউদ্ভিদ জগৎ ) যোগ্যতম হয়ে উঠলাম, না বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। আমাদের ক্রমোন্নয়ন হল। এই বিপ্লব আমাদের শারীরিক বা শারীর-বৃত্তীয় ছাড়া মনন ও চিন্তনেও প্রভাব ফেলল। এবং এই প্রভাবের সম্পূর্ণ ক্ষেত্রটাই কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতার বশবর্তী। অভিজ্ঞতা-জাত এই চিন্তন প্রক্রিয়ার কারণ হল তা কিছুক্ষেত্রে আমাদের বেশ সাফল্য দিল।
উদাহরণ দিয়ে এই আলোচনা কে কিছুটা তরল করা যেতে পারে। যেমন, প্রতিবছর মে মাসে কলকাতায় মারাত্মক গরম পড়ে তাই এই সময় সুতির জামা পড়া ভাল বা পাশ্চাত্যের যে "Day Light Saving” এর ব্যবহার হয়, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়। এই সবই কিন্তু অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তন প্রক্রিয়ার ফল যার প্রয়োগ আমাদের বহুলাংশে উপকৃত করেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার অন্ধ ব্যবহার ক্ষতিকারক। যেমন, কলকাতার এক নাগরিক যদি মে মাসে কানাডার Yellowknife শহরে শুধুমাত্র সুতির জামা পড়ে ঘুরতে যান, তাহলে তাঁর মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ থাকেনা। সোজা বাংলায় একেই কূপমন্ডুকতা বলে।
এই অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার পরিসরকে আরো একটু যদি ব্যপ্ত করি- কলকাতায় দুর্গা পুজার আগে জামা-কাপড়ের ব্যবসা খুব ভাল চলে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নানা ব্যবসায়ী এখানে জামা-কাপড়ের ব্যবসা করতে আসে। আর সেই কোয়ান্টিটি কোয়ালিটির চিরকালীন নিয়মে খারাপ জিনিষও এই সুযোগে বিক্রি হয়ে যায়। এর অন্য দিকটি এই যে দুর্গা পুজার সময় যে নতুন জামা কিনতে হয় বা পরিচিত আত্মীয় কে উপহার দিতে হয় তা আমরা জানলাম কি ভাবে? পরম্পরা থেকে। এই পরম্পরা তৈরি হল কোথা থেকে এবং আমরা কেন এই পরম্পরা কে মেনে নিলাম তা নিয়ে আমরা ভাবিনি কারণ এই পরম্পরা আমাদের বেদনা দেয়নি বরং আনন্দের কারণ হয়েছে। এই পরম্পরার ফলে জামা-কাপড়ের ব্যবসার সাথে যারা যুক্ত তারা যেমন লাভবান হল তেমন শাসক এদের থেকে কর আদায় করে লাভবান হল। বাজারে এই স্বল্পসময়ে যেহেতু অনেক অর্থের যোগান হল এতে বাজারের উপকার হল মানে এক সার্বিক অর্থনীতি গতি পেল।
এইভাবে যদি আমাদের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করি, আমরা আমাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার উৎস পাব। এই অভিজ্ঞতা গুলি তৈরী হয়েছে কিভাবে? অবশ্যই কিছু ঘটনার থেকে এবং সেই ঘটনা ঘটার সময় আমাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া গুলি কিভাবে তৈরি হচ্ছিল? না, অবশ্যই আমাদের অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তাদ্বারা। এইভাবে যদি আমরা প্রতিটি অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার উৎস নিয়ে পর্যালোচনা করি দেখব তা আবার অন্য একটি অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার দ্বারা চালিত। গণিতের মাধ্যমে যদি প্রকাশ করি: আমাদের একটি সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া অনেকগুলি অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার সেট। এবং এই সেটের প্রতিটি এলিমেন্ট আবার একটি অন্য কোনো প্রতিক্রিয়ার সেটের কোনো বিশেষ এলিমেন্ট অর্থাৎ অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত বা তার function। f(x)= প্রতিক্রিয়া, g(y)= অন্য
কোনো প্রতিক্রিয়া, f(x)= x1,x2,x3….xn (x= অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তা), g(y)=y1,y2…yn(y= অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তা)| f(x)=f(g(y))|
এইবার যদি এই সম্পর্কের মাত্রা বৃদ্ধি করে n অবধি বিস্তার করি। তাহলে হয়তো গাণিতিক ভাবে কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে আমাদের প্রতিক্রিয়া বা কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণ প্রকাশ করা যাবে। যদিও প্রতিটি এলিমেন্টের সঠিক অনুসন্ধান ই পুরো সেটটি কে প্রস্তুত করবে। যার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছিনা এখানে। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তাহল একটি সম্পুর্ণ সেট অর্থাৎ প্রতিক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি আমুল বদলে যেতে পারে অন্য সেটের কোনো বিশেষ এলিমেন্ট বা অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তা কে বদলে দিলে, যা নাকি আবার একই রকম ভাবে অন্য কোনো সেটের অন্য কোনো এলিমেন্ট দ্বারা পরিবর্তিত হতে পারে, সহজ ইংরাজীতে manupulate হতে
পারে আমাদের প্রতিক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি।
সুতরাং আমাদের প্রতিক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গির নিয়ামক এলিমেন্ট গুলিকে দুইভাগে ভাগ করা যেতে পারে, ১) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তা ও ২) পরোক্ষ অভিজ্ঞতা-জাত চিন্তা। একটি শিশু ছোটবেলায় কোন উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যেতে ভয় পায়না, তাকে কোলে করে শুন্যে ছুঁড়ে দিলেও সাধারণত হাসতে থাকে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সাথে সেই আচরণ করলে কি হবে তা আর আলোচনার প্রয়োজন রাখেনা। এর কারণ এই যে শিশুটি তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় এই বিষয়ের ধারণা পায়নি, কিন্তু একটি প্রাপ্তবয়স্ক লোক তা পেয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে যে একটি শিশু তার অবোধ কালে কি কিছুই জানেনা? তাই যদি হবে তাহলে খিদে বা ঘুম প্রভৃতি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় সাড়া দেয় কিভাবে? শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া কিন্তু কেমিক্যাল রিএক্স্যান মাত্র এবং যেভাবে খাওয়ার পাতের ধারে থাকা নুন লেবুর ছোঁয়ায় নীল হয়ে যায় ঠিক সেইভাবেই শিশু সাড়া দেয় এখানে চিন্তন বা দৃষ্টিভঙ্গি নেই। তবে মস্তিষ্কের বিকাশের সাথে সাথে সে যখ্ন বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয় জানতে পারে, বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে সেই জিনিষগুলির মধ্যে সে প্যাটার্ন বা মিল খোঁজে। অর্থাৎ, সব বিষয়কেই একটি কোনো ব্যাখা দিয়ে বুঝতে চায়। অনেকটা লেম্যান মিস্ত্রির মতো কি হলে কি হয় অর্থাৎ ইনপুট , আউটপুটের একটা সামগ্রিক বোধ গড়ে নেয়। ব্ল্যাকবক্স ফাংশানের মতো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে হয়তো অবগত নয় বা আংশিক অবগত কিন্তু কি ইনপুটে কি আউটপুট হয় তার এক সুপক্ক ধারণা করে নেয়। এবং এই ধারণার ধার বাড়ে বিভিন্ন পরিবেশে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।সক্রেটিস মানুষের পুনর্জন্ম নিয়ে যখন জোরালো সওয়াল করেছেন তিনি এই শিশুর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যা নিছকই প্রাকৃতিক তার অভিজ্ঞতার উৎস সন্ধানে গিয়ে পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। আবার এও স্বীকার করেছেন যে মানুষ জীবনে কোনোবিষয়ে প্রথম সম্মুখীন হলে তার প্রতিক্রিয়া ওই পরিস্থিতি বা বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্য খোঁজে তার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার মধ্যে। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমরা জেনেছি যে পূর্বজন্ম বা জন্মান্তরের ধারণা ভ্রান্ত। তার নানা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু একটি সরল যুক্তি এই পুনর্জন্ম-পরজন্ম বা আত্মার নিত্যতার সংজ্ঞাকে রূদ্ধ করে দেয় । তাহল এই যে, প্রতি বছরই পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে, এই নতুন আত্মা গুলি তাহলে সৃষ্টি হচ্ছে কোথা থেকে বা তাদের পুনর্জন্ম হচ্ছে কিভাবে? আরো গভীরে গেলে এই আলোচনা নিয়ে একটি দারুণ খিল্লি ও আমোদের সান্ধ্য আড্ডা হতে পারে | সেদিকে না গিয়ে আমরা বরং আলোচনায় থাকি, এবং এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে জন্মকালে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থাকে শুণ্য এবং কোনো বিষয়ে ধারণাও থাকেনা। তা ধীরে ধীরে তৈরি হয় নানা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে | তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে একই পরিবেশে, একই সাহচর্যে বড় হওয়া প্রতিটি শিশু তাহলে তো একই রকম হবে, তাহলে একই হোষ্টেলের সবার রেজাল্ট এক হবে, বা একই পেশায় যুক্ত, একই বেতনের যে সকল ব্যক্তি একই জায়গায় থাকে ( রেল কোয়ার্টার বা পুলিশ কোয়ার্টার ) তাদের সকল বিষয়ে একই সিদ্ধান্ত হবে। | আমার দুটি উদাহরণের দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিল, কিন্তু প্রথম উদাহরণে কিন্তু সকলের রেজাল্ট এক হবেইনা। তাহলে আমরা আলোচনায় কি ভুল পথে এগোচ্ছি! আমাদের উদাহরণটিকে ভালো করে বিশ্লেষণ করা যাক, এখানে নানা পরিবেশ থেকে বিভিন্ন শিশুরা একটি হোস্টেলে এসেছে পড়তে, এরা যেহেতু বিভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছে তাই তার প্রভাব এদেরকে আলাদা করেছে এবং এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন পিতা-মাতার সন্তান তাই এদের মধ্যে DNA-র বিন্যাস ভিন্ন এবং বিভিন্ন বিষয়ে এদের মেধা বা উৎসাহের পরিমাণও ভিন্ন | তাহলে একই পিতামাতার যে সকল সন্তান একই হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে তাদের তো একই রেজাল্ট হওয়া উচিৎ। বাস্তবিক তা হয় না। কারণ, অবশ্যই একই পিতামাতার প্রতিটি সন্তানের DNA গঠন এক হবেনা, এখানেই লুকিয়ে আমাদের স্বতন্ত্র্তা । আর দ্বিতীয়ত, আমাদের আলোচনার জায়গাটি হল আমাদের কোনোবিষয়ে কিভাবে ধারণা তৈরি হয়, আমাদের চিন্তা-প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা । কিন্তু প্রথম উদাহরণটি মূলত ব্যক্তিবিশেষের কোনো বিষয়ে উৎসাহ বা নিষ্ঠা বা অন্য কোনো কারণে তৈরী হওয়া জ্ঞানের তুলনামূলকতা নিয়ে আলোচনা | অর্থাৎ উদাহরণটি এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
।
সুতরাং আমরা একথা বলতে পারি কোনোবিষয়ে যদি একদল লোকের n মাত্রা অবধি একই অভিজ্ঞতা হয়, তাহলে সেই বিষয়ে তাদের একই ধারণা বা সিদ্ধান্ত বা প্রতিক্রিয়া হবে। একটু অন্যভাবে ভাবলে, একদল লোকের মধ্যে যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা গড়ে তোলা যায় তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া কি তা আঁচ করা যায় | শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি। তাই মানুষ বাধ্য হয়েই পরোক্ষ অভিজ্ঞতার বশবর্তী হয়। আবার, পরোক্ষ অভিজ্ঞতা গড়ে তোলবার জন্যে কিছু মানুষ এগিয়েও আসেন। যেকোনো বিষয়ের মতোই এর উপকারী ও ক্ষতিকারক দুই রকম স্বত্তা আছে | উপকারী দিকটি এই যে নানা অজানা বিষয়ের সম্বন্ধে জানা যায় আবার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধেও অবগত হওয়া যায়, হয়তো সেই পরিপ্রেক্ষিত আমাদের ধারণাকেও একটি দিশা দেয় বা আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে ভরিয়ে তোলে। আবার এই অভিজ্ঞতা যে মাধ্যম থেকে আসছে, তার যদি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে তবে সেই দিকে সে আমাদের চিন্তাস্রোতকে ধাবিত করতেও পারে। আমাদের মনকে কোনো বিশেষ ধারণা সঞ্চার করে যে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন করা যায়, তা হিপনোটিজমের বহুল প্রচারে আমরা জানি
।
এবার পরোক্ষ অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীলতা ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতার এলিমেন্ট গুলিকে নিয়ে আলোচনা করব।
পরোক্ষ অভিজ্ঞতা মূলতঃ নানারকম মাধ্যম দিয়ে আমাদের কাছে আসে। যেমন, পরিচিত আত্মীয়-পরিজন-বন্ধু-প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা তাদের পরিচিত কারোর অভিজ্ঞতা, বই-সিনেমা-গান-সোশ্যাল মিডিয়া-রাজনৈতিক বা সামাজিক মঞ্চ প্রভৃতি। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা গুলি বিবরণকারীর নিজের বা অন্য কারোর হতে পারে। সেই কারণেই গাণিতিক রূপ দেওয়ার সময় n মাত্রার কথা বলেছি। এখন কেউ যদি এই পরোক্ষ অভিজ্ঞতার উপর অতি নির্ভর হয়ে পড়ে তাহলে তার যাবতীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রতিক্রিয়া অন্যের উপর নির্ভর করবে, যে নির্ভরকারীর পরিস্থিতির সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত হবেনা। কারণ ভুলে গেলে চলবে না স্থান-সময়-ব্যক্তি বিশেষে একই ঘটনা ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
তাহলে কি দেখা গেল যে শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করলে (যা আবার বহুলাংশে পরোক্ষ অভিজ্ঞতার ফল) যেমন সমস্যা, তেমন পরোক্ষ অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করলেও। এবং এই সমস্যার গভীরতা আজ অনেক গভীরে। কারণ রীতিমত ঢাকঢোল পিটিয়ে মানুষের চিন্তার প্রতিটি প্রকোষ্ঠকে গণিত, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সাহায্যে করায়ত্ত করবার চেষ্টা চলছে। আচরণবাদী অর্থনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, তারা দুদ্দার গতিতে এগিয়ে চলেছেন এবং নানা বিশিষ্ট মহলের থেকে আসছে তার সমর্থন। রিচার্ড থেলার কে নিয়ে মোট ৫ জন আচরণবাদী অর্থনীতিবিদ গত ১৭ বছরে নোবেল পেয়েছেন। অর্থনীতির এই বিশেষ শাখা মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের অযৌক্তিক দিকটি নিয়ে কাজ করে,যার প্রেক্ষিতটি সম্পুর্ণ মনস্তাত্বিক। এবং প্রয়োগিক দিক থেকে এর সাফল্য ঈর্ষনীয়। ব্রিটেন বা আমেরিকায় সরকারী-বেসরকারী ক্ষেত্রে এদের সাফল্য অভাবনীয়। মানুষকে শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধারণা দিয়ে কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা, যা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে সেই মানুষটির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ভারতবর্ষেও এর ব্যবহার দেখা গেছে ইদানীং এল.পি.জি. সাবসিডি ছাড়ের ক্ষেত্রে বা ডিমানিটাইজেশন বা জি.এস.টি. চালুর সময়। মানুষের মধ্যে এই এক ধারণা সঞ্চার করা গেছে যে এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের ভালো হবে এবং কোনো অলৌকিক কারণে পান খেয়ে পাশের বাড়ীর দেওয়ালে কমলা থুথু ফেলা হাজার হাজার দেশবাসী মেনেও নিয়েছে সে কথা। সেই অলৌকিক কারণই হল আচরণবাদী অর্থনীতির সন্তান নাজ তত্ত্বের সূচারু প্রয়োগ।
আলোচনা
এখানেই থেমে থাকার নয় কারণ বাহ্যিক আঘাত আমাদের চিন্তাস্রোতকে কেবল এই একভাবে আঘাত করছেনা। সে
আরও উন্নত ও অব্যর্থ প্রযুক্তির
সাহায্য নিচ্ছে। প্রচার
যন্ত্রের সুকৌশল প্রয়োগে আজ বিগ ডেটা নামটি আমাদের সকলের জানা। এই
বিশেষ প্রযুক্তি ইন্টারনেটে কোনো বিশেষ একাউন্ট থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময় কি ধরনের কাজ করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে ওই একাউন্টের উপযোগী বিজ্ঞাপন গুলি দেখাতে সাহায্য করে। বা সেই একাউন্টের কার্যকলাপ বিচার করে তার মনস্তত্ত্বের ধারণা নিয়ে তার প্রয়োজনীয় ধারণা সঞ্চারে সাহায্য করে। কেমব্রিজের পি.এইচ.ডি. র ছাত্র মাইকেল কোসিনস্কি ও ডেভিড স্টিলওয়েল ২০০৮ সালে একটি বিশেষ অ্যাপ তৈরি করেন ফেসবুকে যা ছিল ১৯৮০ সালে তৈরি OCEAN মডেলের উপর নির্ভর করে তৈরি। যাতে ছিল একগুচ্ছ প্রশ্ন, যার উত্তরের মাধ্যমে একটি মানুষের মানসিক গঠন, নানা বিষয়ে মত সহজেই অনুমান করা যায় এবং এদের গবেষণা লব্ধ ফলের সাফল্য শতাংশ ঈর্ষনীয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুধুমাত্র ফেসবুকে লাইকের বিচারে মানুষের মন যাচাই করা যায়। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা সংস্থাটি ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের উত্থানের সময় এই প্রযুক্তির ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছে। এরা বিভিন্ন সংস্থার থেকে প্রায় ২০ কোটি আমেরিকাবাসীর অনলাইন নানা কার্যকলাপের তথ্য কিনেছে এবং সেই মোতাবেক সেই ব্যক্তিবিশেষকে ধারণা সঞ্চার করেছে বিশেষ জিনিষকে ট্রেন্ডিং করে। বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রত্যেকের জন্যে একই ধারণা সঞ্চার বা বিজ্ঞাপনের কৌশল থেকে সড়ে এসে এরা এক বিশেষ স্বতন্ত্রতাকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা বিজ্ঞাপনের জগতে এক উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে এসেছে। এহেন কৃষ্ণপ্রহরে যখন রাষ্ট্র বা কর্পোরেশন সুকৌশলে আমাদের চিন্তার প্রক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে ব্যবহার করে চলেছে, তখন এহেন চক্রবূহ্য থেকে বের হবার কৌশল নিয়ে আমাদেরও ভাবতে হবে। কারণ আজ আর রাষ্ট্র সেই পিতা নয় যে সন্তানের সেবায় নিয়োযিত। আজ সে এক সুপক্ক ব্যবসায়ী যে প্রতিটি মুহূর্তে লাভ লোকসানের হিসাব কষে চলেছে। রাষ্ট্রের এহেন পরিণতির কথা রবীন্দ্রনাথ "লড়াইয়ের মূল" প্রবন্ধে সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই অনিয়ত মুনাফার বাসনায় রাষ্ট্র টেনে নিয়েছে প্রতিটি ভোটারকে, তারা প্রত্যেকে যত বেশি করে নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে পারবে তত বেশী মুনাফাও অন্য আরো অনেকের কাজের সুযোগ। এবং এই নতুন সুযোগ পাওয়া প্রত্যেকেরও উদ্দেশ্য কেবলমাত্র নিজের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা। জীবনের নেই যে উত্তরোত্তর বেড়ে চলা স্পৃহা এর জোগান দিতে রাষ্ট্র বা কর্পোরেশন বা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাথায় রয়েছে যে সংস্থাটি সে নানা ধারণা তৈরি করছে প্রতিটি ভোটার বা কাষ্ট্মারের জন্য যার মাধ্যম অব্শ্যই আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া বা অতিরিক্ত অনলাইন নির্ভরতা।
অর্থাৎ
যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতার
কাঁধে চেপে আমাদের নানা চিন্তা-প্রতিক্রিয়া-সিদ্ধান্তের চলাচল সেই ব্যক্তিগত চোরা কুঠুরিতে প্রযুক্তির সাহায্যে কর্তা প্রবেশ করেছেন। কর্তার
ইচ্ছায় কর্ম এই আপ্ত বাক্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। এই
ক্ষয়কাল থেকে মুক্তির জন্যে আমাদের প্রয়োজনীয় প্রতিটি জানালা খুলতে হবে। যাতে
কোনো পায়রার খাঁচায় না বন্দী হয়ে পড়ে আমাদের বোধ। আজ
ইন্টারনেটের কল্যাণে যেকোনো বিষয় হাতের নাগালে পাওয়া যায়। কোনো
বিষয়ে মতগঠনের আগে তাই তথ্যের প্রতিটি দিক ভেবে দেখি। যদি
না দেখি বা দেখার সময় পাই তবে যেন সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে না আসি। নির্মোহ বুদ্ধি ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাধনা করি। কোনো বিষয়ে চাট্টি ফেসবুক পোষ্ট বা ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আমাদের সাধারণ প্রবৃত্তি যা মানতে চায়, তাকে দূরে সড়িয়ে যুক্তি কেবলমাত্র যুক্তিকে নির্মমভাবে অগ্রাধিকার দেই। যদি যথাযথ সিদ্ধান্তে না আসি তো চুপ করে থাকা ভালো। সব বিষয়ে চটজলদি সিদ্ধান্তের স্ট্রিটস্মার্টপনায় যে নির্নিমেষ বিপদের ঘন্টা তা অস্বীকার না করে উপায় নেই। সত্যিকারের শক্তির সাথে শক্তির মোকাবিলা নাহলেই বিপদ। বিশ্বযুদ্ধে বৈশ্যদের কাছে ক্ষত্রিয়দের পরাজয়ের পরে দুই তিন দশক ধরে শূদ্ররাও এক তুল্যমুল্য মোকাবিলার পরিস্থিতি রেখেছিল কিন্তু সেই সকল শাসকদের অপদার্থতায় সেই সব রাষ্ট্র্শক্তির বিদায় হয়েছে। তার পরবর্তী ৪০-৫০ বছর ব্যাপি যে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় পৃথিবী শাসন করেছে, তার যেন এক তলানিতে এসে ঠেকেছে আজ। আজ পরিবেশের ক্ষয়কে পর্যন্ত আমরা অস্বীকার করছি। ডেভিড ও চার্লস কোখের মত অসাধু ক্ষমতাবান ব্যব্সায়ীর অঙ্গুলিহেলনে "প্যারিস চুক্তি" ছেড়ে বেড়িয়ে আসছে আমেরিকা। মুখে না বললেও জঙ্গলের পর জঙ্গল উধাও করে এদেশেও পরিবেশের হাজার ক্ষতি করা হচ্ছে সেই ব্যব্সায়ীদের জন্যেই। গরম থেকে বাঁচতে যে এ.সি.র সাহায্য নিচ্ছি আমরা আদতে
তা থেকে গরম বাড়িয়ে আরো এ.সি. বিক্রির পরিস্থিতি তৈরি করছে। এক নির্বোধ গতিময়তা গ্রাস করেছে আমাদের। নিজেদের মুখে এসে পড়ছে যে থুথু তাকেও আশীর্বাদ ভেবে এগিয়ে চলেছি এক অদ্ভুত ভাব সাগরে। আদতে "অনাগরিক" যে মানুষ তাকে যেন কেউ বলার নেই "দাড়াও পথিকবর"। প্রতিনিয়ত
এই দৌড়ের যে খেলা এর আঁচ পেয়েই যেন কবি পিতার মত পিঠে হাত রেখে বলে গেছেন,
" আমাদের স্তব্ধতা,
আমাদের
শান্তি"
কিন্তু সেই শান্তির নিয়তির অপেক্ষায় না থেকে কর্পোরেশনের চোখে চোখ রেখে আমাদের বিশ্রাম চাইবার সময় এসেছে। গত বিশ বছরে প্রযুক্তির বাড়-বাড়ন্ত উত্থান আমাদের যন্ত্র্মানব করে চলেছে। সেই যন্ত্রের কল-কব্জাগুলি এবার সাড়িয়ে নিতে হবে। ছুটি নিতে হবে। বিশুদ্ধ চিন্তন ব্রেক।