কাদা-মাটির মত রং খানা আশার আলোয় চকচক করছিল ।চোখদুটো জুড়ে যেন আলো ঢেলে দিয়েছিল কেউ। তেল চিপচিপে ইস্পাত রঙের ঢেউ খেলানো চুলটা ঘাঢ় অবধি গড়িয়ে এসছে। এক্সপ্রেস ট্রেনের রিজার্ভেশন কামরায় হঠাৎ নৈহাটি থেকে উঠলেন তিনি । নাম জানিনা । ওনার নাম কেউ জানেনা । উনি একা নয় । রিজার্ভেশন কামরার শান্তি ভেঙে ওরা অনেকে ভিড় জমাল। আশেপাশের গুনগুন ক্রমশ তীরের মতো শব্দে পরিণত হল ।
জয়দেবের মেলায় চলেছি আমি আর আমার অফিস কলিগ । ঘুমে চোখ লেগে এসেছিল দুজনেরই।
- " কি দাদা এটা জেনারেল নাকি ?"
-"বুইঝতে পারিনি গো । এই ব্যাইন্ডেলটুকু আসতি দাও"
-"ন্যাকামো নাকি নামুন বলছি"
-"আরে দাদাটো সুব্বাই তো ইকই জায়গাটো যাবোগো"
-"দাদা পয়সা দিয়ে রিজার্ভেশন নিয়েছি কি ধস্তাধস্তি করে যাব বলে ?"
এইবার উনি বললেন । ফুলকির মত ওনার শব্দগুলো সাজিয়ে রাখা আপনার সবুজ লনে আছড়ে পড়ল যেন ।
-"পয়সা তো আমিও দিছি। অসুবিধাটো হুলে রেইল কুম্পানীকে বুলো গো। খামকা আমরা লুইড়ে কি হুবে গো ?"
কাদামাটির কপালটা, সময়ের নানা হিসাব জমিয়ে রেখেছে রেখায় রেখায় । আলো ঢালা চোখ দুটো সকালের সমস্ত প্রশান্তি বিসারী করে হাঁক দিল সাথীদের,
-"হেই চলো রে"
ততক্ষণে আমরা প্রতিষ্ঠানের পেয়াদারা মুখস্থ করা নানা বুলির ভিড় জমিয়েছি। উনি অসীম কাঠিণ্যে সেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে চললেন । রিজার্ভেশন কামরা তখন হতবাক তার তাচ্ছিল্যে।
গাড়ি এগিয়ে চলেছে গেরুয়া ধুলোর দেশে। বাউল সুর তুলেছে, " ওই নয়নে নয়ন দিয়ে আর ফিরাব না..."। আমার ইতিবৃত্তে তখনও ওনার গন্ধ ,বাউলে পেয়েছে আমায় ।
জয়দেবের মেলায় চলেছি আমি আর আমার অফিস কলিগ । ঘুমে চোখ লেগে এসেছিল দুজনেরই।
- " কি দাদা এটা জেনারেল নাকি ?"
-"বুইঝতে পারিনি গো । এই ব্যাইন্ডেলটুকু আসতি দাও"
-"ন্যাকামো নাকি নামুন বলছি"
-"আরে দাদাটো সুব্বাই তো ইকই জায়গাটো যাবোগো"
-"দাদা পয়সা দিয়ে রিজার্ভেশন নিয়েছি কি ধস্তাধস্তি করে যাব বলে ?"
এইবার উনি বললেন । ফুলকির মত ওনার শব্দগুলো সাজিয়ে রাখা আপনার সবুজ লনে আছড়ে পড়ল যেন ।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
-"পয়সা তো আমিও দিছি। অসুবিধাটো হুলে রেইল কুম্পানীকে বুলো গো। খামকা আমরা লুইড়ে কি হুবে গো ?"
কাদামাটির কপালটা, সময়ের নানা হিসাব জমিয়ে রেখেছে রেখায় রেখায় । আলো ঢালা চোখ দুটো সকালের সমস্ত প্রশান্তি বিসারী করে হাঁক দিল সাথীদের,
-"হেই চলো রে"
ততক্ষণে আমরা প্রতিষ্ঠানের পেয়াদারা মুখস্থ করা নানা বুলির ভিড় জমিয়েছি। উনি অসীম কাঠিণ্যে সেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে চললেন । রিজার্ভেশন কামরা তখন হতবাক তার তাচ্ছিল্যে।
গাড়ি এগিয়ে চলেছে গেরুয়া ধুলোর দেশে। বাউল সুর তুলেছে, " ওই নয়নে নয়ন দিয়ে আর ফিরাব না..."। আমার ইতিবৃত্তে তখনও ওনার গন্ধ ,বাউলে পেয়েছে আমায় ।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
বোলপুর স্টেশনে এসে যখন ট্রেন দাঁড়াল তখন বেলা হয়েছে বেশ । স্টেশন থেকে টোটো গাড়ী চেপে চললাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। জামবনি বাসস্ট্যান্ড থেকে কেন্দুলি-জয়দেব যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। আমি আর সৃজিৎ (আমার অফিস কলিগ্) ঠিক করলাম মেলায় যাওয়ার আগে নিজেদের একটু রিফ্রেশ হয়ে নেওয়া দরকার। বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া একটি হোটেলেই ব্যবস্থা করলাম ।
আমরা তৈরি হয়ে বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে তো হয়রান, কি বিশাল লাইন। কাতারে কাতারে লোক চলেছে। সিগারেট -চায়ে নিজেদের সতেজ করে নিলাম লাইনে দাড়িয়েই।
- " ই তো কিছুই নয় গো। কাইল পরশু আররো ভিড় বাইড়বে । মেলাটো লোগ হুইবে । উইখানটোতে থাক্যা খাওয়্যা সব ফ্রীটো আছে ", ভিড় নিয়ে আমাদের আলোচনা শুনে এক সহযাত্রী জানাল। আশেপাশের গ্রাম থেকে সাধু-বৈষ্ঞবরা দলে দলে আসছে । ওইদিকে বেলা এগিয়ে চলেছে।
অবশেষে টিকিট হাতে পেলাম। বোলপুরের শহুরে দস্তানা খুলে বাস চলল খেতের বুক চিড়ে।বাস নয় যেন রকেট। উড়ে চলেছি আমরা। সৃজিতের এক সমস্যা সুযোগ পেলেই ঘুমিয়ে পড়ে ।আর এত সুন্দর হাওয়ায় ও লোভ সামলাতে পারেনি।
বাসের ভিড় দেখে বোঝা যায় এরা মূলত দেহাতি, শহুরে রকমসকম থেকে যোজনখানেক দূরে।জীবন এদের কপালে কখনও আদর করে যায়নি। তবু এরা খুশি। নিজেদের মত করে ভাগ করে নিচ্ছে বাসের সিট। বাসওয়ালা এদের অশিক্ষার সুযোগে এক সিট দুজনকে বেচে দিয়েছে।নামমাত্র ঝামেলার পর এরা হারিয়ে গেল হাওয়ার তালে। তার মাদকতায় আচ্ছন্ন আমিও কখন ঘুমে ঢুলে পড়লাম সৃজিতের গায়ে।
শয়তান সৃজিতের ধাক্কায় ঘুম ভাঙল। বাস এসে থেমেছে নাকি মেলায়। উত্তেজনায় লাফিয়ে ঝুপিয়ে নামলাম বাস থেকে।ভারতের প্রাচীন এই মেলায় আসার মজাটা চেপে রাখা যায়! ক্যামেরা ট্যামেরা নিয়ে সৃজিৎও তৈরি। কিন্ত কোথায় কি? এতো ধূ ধূ প্রান্তর। কটা ছুটকো দোকান।
আধাসামরিক বাহিনীর পেয়াদা আর রাজ্য পুলিশে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা । তারা জানাল মেলা এখনো দূর আছে , হেঁটে যেতে হবে। অগত্যা শুরু হল হাঁটা। একটু এগিয়েই দেখি মোটর ভ্যানের আয়োজন। দশ টাকার বিনিময়ে পৌঁছে দেবে মেলায় । হায়রে ঈশ্বর ! এ পোঁড়াদেশে কি না হয়! সৃজিৎ ভ্যানে উঠতে রাজী হলনা। ক্যামেরায় লাইট ঠিক করতে করতে যাবে বলল।যেতে যেতে কেন্দুলি গ্রাম টাকে দেখতে দেখতে চললাম আমরা ।

Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
পথে নানা আখড়ায় পদাবলী কীর্ত্তন, বাউল গান শুনে এগিয়ে চললাম। কীর্ত্তনে কীর্ত্তনে বিভোর হয়ে উঠলাম। পথে আলাপ হল কলকাতা থেকে আসা বহুলোকের সাথে। গানে গল্পে সন্ধ্যা ঘনিয়ে যখন রাত। আমরা বোলপুরের দিকে পা বাড়ালাম। মানুষের মিছিল তখনও এসে সামিল হচ্ছে এই মহাযাত্রায়। ছয় সাত ঘন্টার নাগাড় চেষ্টায় মেলার শেষ দেখিনি, তবু ফিরতে হত। শহুরে বাধ্যবাধকতা, নিয়মের অ্যালার্ম বেজেই চলেছে। এত আলো, এত রং জড়িয়ে ধরে রাখতে চায়।হয়ত আবার আসছে বছর বেশি সময় নিয়ে আসব। রাতে না থাকলে নাকি জয়দেবের মাহাত্ম্য জানাই যায়না!
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
আধাসামরিক বাহিনীর পেয়াদা আর রাজ্য পুলিশে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা । তারা জানাল মেলা এখনো দূর আছে , হেঁটে যেতে হবে। অগত্যা শুরু হল হাঁটা। একটু এগিয়েই দেখি মোটর ভ্যানের আয়োজন। দশ টাকার বিনিময়ে পৌঁছে দেবে মেলায় । হায়রে ঈশ্বর ! এ পোঁড়াদেশে কি না হয়! সৃজিৎ ভ্যানে উঠতে রাজী হলনা। ক্যামেরায় লাইট ঠিক করতে করতে যাবে বলল।যেতে যেতে কেন্দুলি গ্রাম টাকে দেখতে দেখতে চললাম আমরা ।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
রাঙামাটি রাঙিয়ে দিল আমাদের । হেঁয়ালি না করেই বলি ধূলোয় তখন একাকার আমরা। সৃজিৎ ক্যামেরা বাঁচিয়ে চলেছে।"তবু তাঁর প্রেমে মলিন হয়ে যাই", আমরাও চললাম সে পথে । সে এক এলাহি আয়োজন। অজয়নদের উপর বাঁধ বরাবর । মেলার শুরু আছে শেষ নাই। মেলা তখনো জমেনি তবু তার বিশালতা অকল্পনীয়।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
উদ্দেশ্যহীনভাবে এগিয়ে চললাম আমরা কিছুক্ষণ। চতুর্দিকে সাধুদের আখড়া। তার ম্যারাপ খাটানো হয়েছে। চমকে আর লাস্যে ভরা কুরুচির গান , ভয়ানক সব চেহারার তান্ত্রিক আর গাঁজার গন্ধে ম ম করছে। অন্ধভক্তকুল, নানা গুরুদেব তার আখড়া, মকর সংক্রান্তির পুণ্যস্নানের ঢল। সে এক বিদিগিচ্ছিরি অবস্থা। আধুনিক এবং প্রাচীন বাংলার মেলবন্ধন হিসাবে ধরা হয় যে গীতগোবিন্দকে তার সৃষ্টির সাথে জড়িত এই বিশেষ দিনটি যে কুসংস্কারের উদযাপন তিথি দেখে মন ভেঙে গেল।
কবি জয়দেব আনুমানিক ১২০০-১৩০০ সালে লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি থাকাকালীন গীতগোবিন্দ রচনা করেন। কথিত আছে সে রচনা কালে কবি এক জায়গায় এসে আর লিখতে পারছিলেন না। স্বয়ং কৃষ্ঞ নাকি এসে তখন লেখা এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। সে কাহিনী আজকের যুগে হাস্যকর। কিন্তু গীতগোবিন্দ সাহিত্যের দরবারে এক অবাক সৃষ্টি।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
কবির বাসস্থলে বহুযুগ বাদে ১৬৮৩ সালে ঔরঙ্গজীবের আমলে বর্ধমানের রানী, তদানিন্তন কেন্দুলির শাসক রাধাবিনোদের মন্দির স্থাপন করেন । অতি সাধারণ এ মন্দির টেরাকোটা শিল্পের এক নির্দশন। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে এর অবস্থাও সঙ্গিন।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
এ মেলা আজ দেবতার মাহাত্ম্য উদযাপন, ব্যাক্তিগত সিদ্ধিলাভ, চটুল গান আর তান্ত্রিক কর্মকান্ডের এক মিলন ক্ষেত্র। মানুষ জয়দেব কে বাসস্ট্যান্ড করে রেখেছে। আর কিছুই মনে রাখেনি। ভাঙ্গা মন, খিদের জ্বালায় জীর্ণ শরীর নিয়ে প্রায় ঘ্ন্টা পাঁচেক ঘুরে আমরা যখন বাজার চত্বরে এলাম, সেখানে এক বাঁশীওয়ালার বাঁশী শুনে মন ভরে উঠল।
সরকারি মঞ্চে জয়দেবের কাহিনি খণ্ড চিত্রে বর্ণিত। কেউ সে দিকে ফিরেও দেখেনা।বেলা গড়িয়ে তখন মাথা রেখেছে অজয়ের বুকে মাথা রেখেছে। আমরা লক্ষ্মন দাস বাউলের আখড়া খুঁজতে বেরলাম। পৃথিবী বিখ্যাত এই বাউলের ঘর খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলাম " কেন্দুলি সাহিত্য সভা"র। যার দেওয়ালে উজ্জ্বল অবস্থান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। সুনীল গাঙ্গুলিকে নিয়ে এদের আলোচনা সভার হদিশ পেলাম দেওয়ালে টাঙানো কর্মসূচীতে। মন ভালো হয়ে গেল দেখে।নানা অলি গলি পেড়িয়ে এসে পৌছালাম সুধীর ক্ষ্যাপার সুপুত্র লক্ষ্মন দাসের আখড়ায়। শিল্পী নিজে এগিয়ে এলেন দেখা করতে। তার উষ্ঞ আতিথেয়্তায় মন ভরে উঠল। নানা আড্ডায় গল্পে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার বেড়িয়ে পড়লাম আমরা।
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>
পথে নানা আখড়ায় পদাবলী কীর্ত্তন, বাউল গান শুনে এগিয়ে চললাম। কীর্ত্তনে কীর্ত্তনে বিভোর হয়ে উঠলাম। পথে আলাপ হল কলকাতা থেকে আসা বহুলোকের সাথে। গানে গল্পে সন্ধ্যা ঘনিয়ে যখন রাত। আমরা বোলপুরের দিকে পা বাড়ালাম। মানুষের মিছিল তখনও এসে সামিল হচ্ছে এই মহাযাত্রায়। ছয় সাত ঘন্টার নাগাড় চেষ্টায় মেলার শেষ দেখিনি, তবু ফিরতে হত। শহুরে বাধ্যবাধকতা, নিয়মের অ্যালার্ম বেজেই চলেছে। এত আলো, এত রং জড়িয়ে ধরে রাখতে চায়।হয়ত আবার আসছে বছর বেশি সময় নিয়ে আসব। রাতে না থাকলে নাকি জয়দেবের মাহাত্ম্য জানাই যায়না!
Photo Cortsey: Srijit Pan <pansrijit6@gmail.com>